অবাক নির্বাক

“এই গল্পের কোন ভুমিকা নেই
যেদিন অন্ধকারের রঙ হলুদ হবে
পশ্চিমে উড়ে যাবে বিষাদ আকাশ ।”
…………………………………………………………………………………………..
আমাদের পাজেরো খুব দ্রুত এগিয়ে চলছে। বাইরের প্রচণ্ড বাতাসে শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেছে , নিজেকে কেমন যেন সাপের মত মনে হচ্ছে। কেউ হটাৎ করে হাত দিলে ভয় পেয়ে যাবে।শরীরটা এত ক্লান্ত লাগছে যে হাতের ঘড়িতে কয়টা বাজে সেটা দেখারও শক্তি পাচ্ছিনা। পাশেই কামরুল চাচা, মিরা ভাবি,কনক ভাই বসে আছেন। কিন্তু কাউকে এখন ডাকতে ইচ্ছা করছেনা। কষ্ট করে ঘড়ি দেখার চেষ্টা করলাম ,একি ঘড়ি ৮টার ঘরে এসে থেমে আছে। ঘড়ির ব্যাটারিটা মনে হয় গেছে। আচ্ছা এখন সময় জানাটা কি খুব দরকার ? ক্লান্তি এমনভাবে ধরেছে কিছুই করতে ইচ্ছা করছেনা।যখন খুব ক্লান্ত থাকে শরীর তখন চোখ বন্ধ করতেও কষ্ট লাগে। সবাই চুপচাপ ,কোন কথা বলছেনা । মনে হয় আমার মতো সবারই একই অবস্থা। তবে খলিল চাচা কিছুক্ষন পর পর মোবাইলে কথা বলছেন। বাইরের প্রচণ্ড বাতাসে কিছু শুনা যাচ্ছেনা। আমরা যাচ্ছি আমাদের গ্রামের বাড়িতে কিন্তু কেন যাচ্ছি কেউ আমাকে বলেনি। আমাকে মনে হয় কেউ কিছু বলার প্রয়োজন মনে করছেনা।
গ্রামের বাড়ি পৌছালাম সকাল ৭টায়। গাড়ি থেকে নামতেই দেখি অনেক ভীর।এত ভীর কেন? গ্রামের বাড়ি আসা হয়না প্রায় দুই তিন বছর হবে। কিন্তু এত ভীর হবে কেন।এলাকায় কনক ভাই এর অনেক নাম ডাক। মিরা ভাবি এই প্রথম এসেছেন ওনাকে দেখার জন্য এত ভীর হতে পারে ।মিরা ভাবি অসম্ভব সুন্দরী। কিছু কিছু মেয়ে আছে যাদের এর থেকে বেশী সুন্দর হলে ভাল লাগেনা। বেশী সাজলে এদের আসল সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়, এরা হচ্ছে স্নিগ্ধ সুন্দর। এদের চেহারার মধ্যে একটা পবিত্র পবিত্র ভাব থাকে সব সময়।ইতিহাসের হেলেন অফ ট্রয়, মিশরের ক্লিওপেট্রা এদের পাশে মিরা ভাবির নামও থাকা উচিত।
আমরা ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে যেতে লাগলাম। বাড়ির সামনেও দেখি অনেক মানুষের জটলা। ব্যাপারটা একটু সন্দেহজনক। আরে এটা কে বিজয় না । অনেকদিন পর দেখা । ডাক দিলাম শুনতেই পেলনা। অনেক মোটা হয়ে গেছে। অনেকেই বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে।জেরিন ভাবির সাথে এইটা কে। আরে এইটাতো দেখি আসিফ। চেনাই যাচ্ছেনা, সেই পিচ্ছিকালে দেখেছিলাম। কতবার আমার কোলে হিসু করে দিয়েছিল এই ছেলেটা তার কোন হিসাব নাই। কিন্তু ওরাতো শুনেছিলাম সিলেটে চলেগিয়েছিল। আমরা আসব বলে কি আসছে। আমাদের আসাটা কি এত গুরুত্বপূর্ণ কিছু। কখনওতো এমন হয়নাই। হোয়াটস গোয়িং অন!!! বাড়ির উঠানে পা রাখতেই দেখি আমাদের দেখে সবাই কাঁদছে। আরে সবাই এমন করে কাঁদছে কেন। অর্পিতা খালাকে দেখা যাচ্ছে ,ওনাকেও অনেকদিন পর দেখলাম। প্রায় ৩ বছর হবে। খালাকে বললাম কি হয়েছে এখানে , তুমিও এমন করে কাঁদছ কেন। আমাকে না বললে আমি বুঝবো কি করে। একমাত্র আমি ছাড়া সবাই কাঁদছে । আমার শরীর এত ক্লান্ত যে আমি সামান্য নড়ার শক্তিও পাচ্ছিলাম না।
সবচেয়ে বড় কথা মা,বাবা কোথায়, ওনাদের দেখছিনা কেন। ঘরের ভিতরে যাওয়া দরকার। মা,বাবার কিছু হয়নিতো আবার। এইতো মা,বাবা দুজনই একসাথে আসছেন। কিন্তু এত জোরে জোরে মা অমিত আমিত বলে চিৎকার করছেন কেন। আমার কাছে এসেই ফিট হয়ে গেলেন। মার চোখ মুখে পানি দেওয়া হল। উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। বাবা কেবল অঝোরে কান্নাকাটি করছেন। মার পর বাবাও আমাকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। শেষ কবে বাবা আমাকে এভাবে জড়িয়ে ধরেছিলেন আমার ঠিক মনে নেই। বড় হওয়ার সাথে সাথেই বাবা মায়ের আদরের বহিঃপ্রকাশটা হারিয়ে যায়।
সবাই আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা। আমার গায়ে সাদা কাপর জরানো । ছোট একটা অন্ধকার জায়গায় শুইয়ে দিল আমাকে ।আমি জোরে জোরে চিৎকার করছি কিন্তু কেউ আমার কথা শুনতে পাচ্ছেনা। সব ভেঙ্গে উপরে উঠতে চাচ্ছি কিন্তু কিছুতেই আমি নড়তে পারছিনা। আমার উপর মাটি দিচ্ছে কেন সবাই। চিৎকার করে বাবাকে ডাকছিলাম। আমার দম বন্দ হয়ে আসছে। বাবা শুনছেনা কেন,এত নিষ্ঠুর হয়ে গেলে কেন সবাই। আমি কেবল প্রাণপণে চিৎকার করছি,সমস্ত শক্তি দিয়ে শুধু চিৎকার করছি।
———————————
প্রতিদিনের মত আজকেও সকালে বাবা খবরে কাগজ পড়ছেন আর হাতে চিনি ছাড়া চা । এই জিনিসটা বাবা কিভাবে গলাধঃকরণ করেন বুঝিনা।নিশ্চয় খুব বাজে। বাবাকে দেখে কিন্তু তা মনে হয়না। ওনি বেশ মজা পান বলে আমার ধারনা। ঘড়িতে চোখ রাখতেই দেখি ৯টা বাজে।আরেকটু পর ঘুম ভাঙ্গলে খবরই ছিল। । আজ অনেকদিন পর তন্দ্রার সাথে দেখা হবে।১০ টায় দেখা করার কথা, কিছুতেই দেরি করা যাবেনা।একটু দেরী করলেই মেয়েটা রাগ করে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s