জোছনা জোয়ার

হটাৎ গভীর ঘুম ভেঙ্গে গেলে দ্বিধায় পরতে হয়। একবার মনে হচ্ছে হলের সিটে শুয়ে আছি আবার মনে হচ্ছে বাসায় শুয়ে আছি। ঘুম সম্পূর্ণ ভাঙ্গার ঠিক আগের সময়টায় এইরকম হয়। চোখ খুলতেই দেখি অনেক দিনের পরিচিত সেই ছাদ,জানালা,দরজা,শৈশবের সেই রুম। দীর্ঘদিন না আসার কারনে এই স্মৃতিতে অনেকটা ধূলা জমে গেছে।গতকাল রাতে হুট করেই চলে আসছি গ্রামের বাড়িতে। বিশাল এই বাড়িতে আমি এখন একা । জানালার কাঁচ ভেদ করে সূর্যের আলো ঠিক আমার মুখের উপর পরেছে । কাচের প্রতিসরণের কারনে সূর্যের আলোটা অনেক কোমল লাগছে। সূর্যের আলোর দিকে সোজা তাকানো যায়না কিন্তু প্রতিসৃত আলোর দিকে তাকালেই একটা আদর আদর ভাব চলে আসে ।মনে হচ্ছে অনেকদিন পর পরম মমতায় কেউ আমায় আদর করে দিচ্ছে ।
অনেকদিন পর গ্রামের রাস্তায় হাঁটছি। আত্মীয়স্বজন কেউ জানেনা আসছি না হয় সকাল বেলায় অনেকেই চলে আসত। পথে হটাৎ তপন কাকার সাথে দেখা। সংসারের হাল টানতে টানতে বেচারা অনেক শুকিয়ে গেছে।
-কেমন আছ অমিত?
– জি কাকা ভাল । আপনি কেমন আছেন?
-গরীব মানুষের আর ভাল থাকা ! কবে আসছ, আর সাথে কে কে আসছে ?
-আমি একাই আসছি,গতকাল রাতে। হটাত আসতে ইচ্ছা করল।
– তোমরা বাবা আমাদেরতো ভুলেই গেছ। আচ্ছা , এ হচ্ছে প্রান্থ । আমার ছেলে। ভাল নাম প্রান্থ ভোমিক।
-আমি মুচকি হেসে বললাম খারাপ নাম কি ?
– কাকাও হাসলেন। ক্লাস থ্রিতে পরে। খুব ভাল ছাত্র।গত বছর ফার্স্ট হয়েছে।
ওনার সাথে গল্প শেষ করে আবার হাটা শুরু করলাম। হাটতে হাটতে আমাদের স্কুলে চলে আসলাম। কত পরিবর্তন হয়েছে এই স্কুলটার। আমি যেন এখনও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি অনিমেষ স্যার নিচতলার শেষ ক্লাসরুমটায় আমাদের অঙ্ক করাচ্ছেন। অদ্ভুত সব স্মৃতি আমার সামনে এখন ভাসছে। স্মৃতিগুলো চলমান হয়ে গেছে আর আমি স্থির হয়ে আছি। এই মাঠে আমরা কত ফুটবল,ক্রিকেট,হ্যান্ডবল খেলেছি।একবার আমরা আমাদের সিনিওর ব্যাচকে হারিয়ে হ্যান্ডবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম।কাপটা মনে হয় হেডস্যারের রুমে এখনও আছে।আরেকবার মনে আছে বৃষ্টির দিনে ক্লাস হয়নাই তাই সবাই ফুটবল খেলতে চলে আসলাম পাশের কলেজ মাঠে।সম্পূর্ণ মাঠেই বালু ছিল।মাটের মধ্যে কে জানি বালু দিয়ে উঁচু করে গোলপোষ্ট দিয়ে রাখছে। আমি দৌড়ায় গিয়ে ভাবলাম ঐ বালুর পোষ্টে কিক করবো কিন্তু ভিতরে একটা আস্ত ইট ঢোকায় রাখবে কে জানতো।সাথে সাথে পায়ের চামড়া ছিলে রক্ত বের হয়ে গিয়েছিল। তারপরও সেদিন ফুটবল খেলেছিলাম।
এইযে এই বিল্ডিংএর ছাদে একবার কদম ফুলের  পাপড়ি ফেলার পর ছোট বলের মতো যেটা থাকে ওইটা দিয়ে ফুটবল খেলছিলাম ।ঐ ছাদে কোন রেলিং ছিলনা। এর জন্য এক স্যার আমাদের তিন জনকে বেত দিয়ে ইচ্ছামতো মেরেছিলেন।এর মধ্যে এক ফ্রেন্ড ছিল সাদা চামড়ার,শহুরে ছেলে। ওর জন্য খুব মায়া হচ্ছিল। বেচারা খেলতে চায়নি আমি তাকে জোর করে নিয়ে এসেছিলাম। লজ্জায়,রাগে লাল হওয়ার কথা শুনেছি কিন্তু কষ্টে কেউ লাল হয়ে যায় সেদিন দেখেছিলাম।ব্যাথায় বেচারার চেহারা থেকে রক্ত বেরিয়ে আসবে এমন অবস্থা ।ঐ স্যার আমার অনেক পছন্দের ছিল,আমাকেও অনেক পছন্দ করতেন ।নিজের ছেলের নাম রেখেছিলেন আমার নামের সাথে মিল রেখে।
এই যে টিনের ক্লাস রুমটা দেখা যাচ্ছে। ঠিক কোন ক্লাসে ছিলাম ঐ রুমটায় মনে নেই।ছোট একটা ঘটনার কথা মনে আছে। ঐদিন ক্লাসে স্যার আসে নাই, কিসের যেন মিটিং ছিল। আমি আর নাহিদ নামের এক ফ্রেন্ড কিছু একটা নিয়ে মারামারি করছিলাম। মাঝখান থেকে স্বপন নামের এক ফ্রেন্ড গিয়ে স্যারের কাছে নালিশ করে আসলো আমাদের নামে। ঐ স্যার এমনেই খুব রাগি , খিটখিটে মেজাজের।স্যার এসে ২জনকেই  ইচ্ছামত মারল,আমার লাইফের সবচেয়ে কঠিন মাইর খাওয়া ছিল এইটা।
অনেক স্মৃতি এই স্কুলটায়। এই যে কদম গাছ। আমার ছোট বেলা থেকেই প্রিয় ফুল ছিল কদম। বিশেষ করে বৃষ্টিতে ভেজার পর কদম ফুলগুলোকে অসম্ভব সুন্দর লাগত। কদম ফুল দিয়ে ঢিল ছুড়াছুড়ি করা,ক্লাসের বারান্দায় ফুটবল খেলা কি মজার দিনগুলাই না ছিল!! এই কদম গাছের পাশেই আমরা একবার একটা চড়ুই পাখি কবর দিয়েছিলাম। তখন আমরা ক্লাস ফাইবে পড়ি। রাতে অনেক ঝড়-তুফান হয়েছিল। পরেরদিন স্কুলে গিয়ে দেখি ক্লাসের সামনে একটা চড়ুই পাখি পরে আছে। কয়েকজন ফ্রেন্ড মিলে দেখলাম পাখিটা মারা গেছে। মন অনেক খারাপ হল আমাদের।সিদ্ধান্ত নিলাম এটাকে কবর দিব। পাশের একটা টেইলারসের দোকান থেকে ছোট একটা সাদা কাপড় মেনেজ করল একজন। পরে খুব যত্ন করে একটা গর্ত করলাম কদম গাছের পাশে। মৃত পাখিটাকে কবর দিলাম আমরা।কবর দেওয়ার পর জানাযাও পড়া হল। আমাদের মধ্যে একজন হুজুর টাইপ ছেলে ছিল যে প্রতি এসেম্বলিতে কোরআন তেলাওয়াত করত,নাম দেলোয়ার।দেলোয়ারই জানাযা পড়িয়েছিল । এসেম্বলির কথা মনে করাতে স্কাউটের কথা মনে পরে গেল। স্কুলের স্কাউট দলের ফিল্ড কমান্ডার ছিলাম আমি। সবচেয়ে সুখময় স্মৃতি ছিল একবার আমাদের স্কুলে যখন মন্ত্রী এসেছিল। আমি সম্পূর্ণ মাঠ কোচকাওয়াজ করে যখন মন্ত্রীর সাথে হ্যান্ডসেক করলাম মন্ত্রী আমাকে বললেন অনেক কষ্ট করেছ ,ভাল লেগেছে। মন্ত্রীর সাথে কথা বলতে পেরে নিজেকে কত ভাগ্যবান মনে হয়েছিল তখন, হা হা।
একটু পরেই এক ফ্রেন্ডের সাথে দেখা,নাম অনিক। ও আমাকে তুমি তুমি করে বলছে।অথচ আমরা একসাথে কত খেলাধুলা করেছি, মারামারি করেছি। আমাকে কি বলে ডাকতো সময়ের ব্যবধানে ও এখন সেটাই ভুলে গেছে।এইরকম অবস্থায় অনেক সময় পরতে হয়।দেখা গেছে অনেকদিন পর একজনের সাথে দেখা, আমি ভুলে গেছি তাকে তুই নাকি তুমি করে ডাকতাম।আবার এমনও হয় চেহারা পরিচিত কিন্তু সে সমবয়সী নাকি সিনিওর এইটা মনে করতে পারছিনা।গ্রামে গেলে আমার ক্ষেত্রে এইটা বেশী হয়। তখন খুব সাবধানে কথা বলতে হয়। তখনকার অতিসাবধানী কথাগুলো অনেকটা এইরকম হয়।
কি অবস্থা,দিনকাল কেমন চলছে, অনেকদিন পর দেখা,আজকে খুব গরম পড়ছে এইটাইপ কিছু বাক্য। এই টাইপ কথাগুলা তুই,তুমি,আপনি সবার সাথেই যায়।যদিও এইভাবে এদের সাথে বেশীক্ষণ কথা বলা যায়না।তখন আচ্ছা ঠিক আছে পরে কথা হবে এখন যাই একটু কাজ আছে , এইসব বলে কেটে পড়তে হয়।
সন্ধ্যা হয়েছে, আমি দাড়িয়ে আছি একটা ব্রিজের উপর। আমাদের গ্রামের একমাত্র ব্রিজ ,তিতাস নদীর উপর। যদিও এখানে নদীটার দীর্ঘ খুবই কম। এই ব্রিজ হওয়ার আগে আমরা নৌকা দিয়ে নদী পারাপার হতাম। আমার নানার বাড়ি ছিল পাশের গ্রামে। ভাল না লাগলেই চলে যেতাম। নৌকা পার হতে লাগত মাত্র একটাকা। এই নৌকা পারাপার করে অনেকের সংসার চলত। ব্রিজ হওয়ার পর সব নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।বেচারা মাঝিরা বিপাকে পরে। সন্ধার পর ব্রিজের জায়গাটা আমার খুব প্রিয় ।বিশেষ করে যখন চারপাশ নিশ্চুপ থাকে, নদীর পার থেকে যখন হাল্কা ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে যায় আর যখন আকাশে জোছনা থাকে। কোন এক অদ্ভুত কারনে পছন্দের সবকটাই আজকে একসাথে পেলাম।একেবারে খাপে খাপ পঞ্চুর বাপ।
একটা মেয়ে একটু দূর থেকে হেটে আসছে। মেয়েটির চেহারা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছেনা। মনে হচ্ছে মেয়েটা অসম্ভব রুপবতি। অসম্ভব রুপবতি মেয়েদের চেহারা জোছনার আলোয় অস্পষ্ট দেখায়। মেয়েটি আরেকটু কাছে আসতেই চেহারা স্পষ্ট হয়ে উঠল।খুব চেনা একটু মুখ।এখানে তার আসার কথানা । আমি খুব অবাক হয়েছি, আসলেই খুব অবাক হয়েছি। এইরকম অবাক জীবনে খুব বেশী হয়নি কিন্তু সেটা এই মুহূর্তে তার কাছে প্রকাশ করা যাবেনা।খুব কাছের মানুষকে অবাক করানোর মতো আনন্দ খুব কমই পাওয়া যায়। আমি তাকে এই মুহূর্তে সেই আনন্দ পাওয়া থেকে বঞ্চিত করতে চাই।তার প্রতি আমার অনেক অভিমান জমা আছে।
– কেমন আছ ?
-ভাল । তুমি কেমন আছ ?
– অবাক হওনি আমি এসেছি?
– আমি উত্তর না দিয়ে বললাম,তোমাদের না কানাডা চলে যাওয়ার কথা?
-আজকে ২৮’এপ্রিল ।
-হুম ।
– শুভ জন্মদিন।
– তুমি মনে রাখবে এইটা আশা করিনি।
-মানুষ অনেক কিছুই আশা করেনা তারপরও পেয়ে যায়। আবার অনেক কিছু আশা করেও পায়না।
তন্দ্রার পরশু সপরিবারে কানাডা চলে যাওয়ার কথা। সেটা শুনার পর আমি গ্রামে চলে আসি । অনেক মন খারাপ হলে আমিএইখানে চলে আসি।তন্দ্রা ঢাকা থেকে চলে আসবে ভাবিনি। কেন আসছে জানিনা।কিছু জিনিস আজানা থাকাই ভাল।
আমি আর তন্দ্রা বসে আছি নদীর পারে। আমাদের মাথার উপরে স্নিগ্ধ জোছনা। দুজনেই চুপচাপ। তন্দ্রা আমার হাত শক্ত করে ধরে আছে। সে শব্দ না করে কাঁদছে । শব্দ না করে কাঁদতে পারা এক ধরনের গুন। অসম্ভব রূপবতী মেয়েদের অনেক গুন থাকে। সব কাজেই তাদের রুপের একটা ছোঁয়া রেখে দেয়। আমি চেয়ে আছি জোছনার দিকে। জোছনার আলোর অনেক অদ্ভুত ক্ষমতা থাকে, কেউ হাজার কষ্ট নিয়েও যদি জোছনার আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে, যতক্ষণ তাকিয়ে থাকবে কষ্টগুলো জোছনার আলোর নীল রঙের সাথে মিশে যাবে, হাল্কা হয়ে উড়ে বেড়াবে। আমাদের দুজনের কষ্টগুলো জোছনার আলোর সাথে মিশে যাচ্ছে।আর আমরা ভেসে যাচ্ছি জোছনা জোয়ারে ।
“গঙ্গার ও পারে ঐ নতুন চাঁদ,
আর এপারে তুমি আর আমি,
এমন সমাবেশটি অনন্তকালের মধ্যে কোনোদিন ই আর হবেনা “
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে হয় এমন কোন দৃশ্যের কল্পনা করেই লাইনগুলা লিখেছিলেন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s