লীলাবতী

– মন  খারাপ ?
– না,খুব জটিল একটা সমস্যা নিয়ে ভাবছি। আচ্ছা বলতো পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট কণার নাম কি ?
– সাইন্স সম্পর্কে আমার ধারণা  খুব কম । ছোটবেলায় পড়েছি পদার্থের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম অংশ  অ্যাটম। এটাকে আবার ভাঙ্গলে নিউটন আরও হাবিজাবি কি কি পাওয়া যায় । সবই মুখস্ত বিদ্যা।এইগুলা কিছুই  বুঝতাম না। মনে হতো কেউ একজন ইচ্ছামত যা মন চায় লিখছে আর আমরা পাশ করার জন্য মুখস্ত করতাম ।
– তোমার সেই ছোটবেলাতো এখন আর নেই। পৃথিবী অনেক এগিয়ে গেছে,  সবচেয়ে ছোট কণার নাম কোয়ার্ক। অনুমান করতো কোয়ার্কের সাইজ কেমন হতে পারে?
-অ্যাটম থেকে ছোট ? নাকি আরও ছোট ?
– হা হা , এক সেন্টিমিটারের মিলিয়ন  বিলিয়ন বিলিয়ন ভাগ
– আমার কেন জানি এইগুলা বিশ্বাস হয়না , এত ছোট জিনিস পরিমাপ করবে কি করে ? আচ্ছা বাদ দাও । এইগুলা উদ্ভট বিজ্ঞানের কথা রাখো এখন । একটা কাজ করে দাও। আমার খুব কাছের এক বান্ধবীর মেয়ে হয়েছে। এখন সে আমাকে খুব করে বলছে একটা সুন্দর নাম রেখে দিতে । আমার মাথায় কিছু আসছে না। প্লিজ তুমি একটা বলে দাও ।   
–   কোয়ার্ক রেখে দাও ।
– আমি ফোন রাখলাম।
– আরে মজা করলাম। আচ্ছা দাড়াও একটু চিন্তা করি।
– “লীলাবতী” রাখতে বলতে পারো।লীলাবতী ছিল ভারতের বিখ্যাত গণিতবিদ ভাষ্করাচর্যের কন্যা ।যদিও লীলাবতীর জীবনে অনেক দুঃখ ছিল । ভাষ্করাচর্য তার কন্যাকে ধীরে ধীরে পাটিগণিত শেখান।আর তিনি চেয়েছিলেন তার কন্যাকে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ মনে রাখুক তাই তিনি পাটিগণিতের একটি বইটি লিখেন এবং মেয়ের নামে নাম দেন, “লীলাবতী” ।

Whilst making love a necklace broke.
A row of pearls mislaid.
One sixth fell to the floor.
One fifth upon the bed.
The young woman saved one third of them.
One tenth were caught by her lover.
If six pearls remained upon the string
How many pearls were there altogether?


লীলাবতী বইটির শেষ দিকে  ভাষ্করাচর্যের একটা কথা ছিল
“ এই পৃথিবীতে সুখ আর সমৃদ্ধি গুণিতক হারে বৃদ্ধি পাবে যদি লীলাবতীকে তার উপযুক্ত মর্যাদা দিতে পারে ”
– আচ্ছা এখন রাখি , বান্ধবীকে ফোন করে নামটা বলি ।

তন্দ্রা ফোন রেখে দিয়েছে । আমি জানি একটু পরেই সে ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করবে লীলাবতী নামের অর্থ কি। আমি যখন বলবো, যে লীলা করে বেড়ায় সেই লীলাবতী তখন তন্দ্রা খুব রাগ করে ফোন রেখে দিবে । আমি অনেকক্ষণ ফোন না দিলে সে নিজেই মোবাইলে মেসেজ দিবে কিন্তু সেই মেসেজে কোন শব্দ থাকবেনা , থাকবে কিছু অদ্ভুত সিম্বল ।কিছু শব্দহীন অভিমান।  সে বার বার তার রাগ কেন ভাঙ্গাচ্ছিনা সেটার নিঃশব্দ সিগন্যাল দিতে থাকবে যতক্ষণ না পর্যন্ত আমি ফোন দিয়েছি ।

—————————————————————————-
১১.১১.২০১৮
মেলাটেনার স্ট্রাস
আখেন , জার্মানি


পুনশ্চঃ এই লেখাটার স্থান অনেক প্রশস্ত, বাংলাদেশ থেকে জার্মানি পর্যন্ত ।
আবারও  পুনশ্চঃ আমি কোন লেখক নই । কিন্তু মাঝে মাঝে কেন জানি লিখতে ইচ্ছা করে,বিশেষ করে রাতে । রাত যত গভীর হয় আবেগ তত তীব্র হয়। মনের মধ্যে এত সুন্দর সুন্দর কথা ঘুরপাক খায়, আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই । কিন্তু পরে যখন লিখতে বসি সেই মুহূর্তের আবেগটুকু আর থাকেনা। যা লিখি সেটা নিজেই ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছা করে। তাই নিজের এই  লেখাগুলা “আমার ছেড়া খাতা” ব্লগে লিখে রাখি মাঝে মাঝে। আমার লেখার কেন্দ্রীয় চরিত্রে থাকে তন্দ্রা নামে একটি মেয়ে  আর অমিত নামের একটি ছেলে । তন্দ্রা সম্পূর্ণ কাল্পনিক একটি চরিত্র , এখন পর্যন্ত এই চরিত্রটি লেখার সময় বাস্তবের কাউকে কল্পনা করিনি । কিন্তু অমিত চরিত্রটি লেখার সময়  মাঝে মাঝে নিজেকে এই চরিত্রের মধ্যে ভাবতে শুরু করি । পরক্ষণেই বুঝতে পারি আমি কোন গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র নয়, আমি অতীব সাধারণ শ্রেণীর একজন। তখনই আমি অমিত চরিত্রের ছায়া থেকে সরে বাস্তবতায় ফিরে আসি। আমাকে ক্লাস করে এসে কি খাবো সেটা চিন্তা করতে হয় , রান্না করতে হয় কিন্তু গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রদের তা করতে হয়না ।   

নিষিদ্ধ সময়ের গল্প

মঙ্গলবার ,২১শে অগাস্ট,২০০৭
দুপুর ১২টাঃ
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কাল । পুলিশের সাথে ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টদের ব্যাপক সংঘর্ষ চলছে । সাথে যোগ দিয়েছে বুয়েট,ঢাকা মেডিক্যাল সহ আর অনেক প্রতিষ্ঠানের ছাত্র । আমি তখন সবে মাত্র ঢাকা সিটি কলেজে ভর্তি হয়েছি । বড় ভাইয়ের সাথে বুয়েটের হলে থাকি। শেরে বাংলা হল, রুম নাম্বার ৪০১১। একটা সিটেই তখন ২জন কষ্ট করে থাকি। বড় ভাই তার থিসিসের কাজে সেদিন কিশোরগঞ্জ গেছে।হলের বারান্দা থেকে দেখলাম রাস্তায় অনেক মানুষ,সবাই খুব বেস্ত হয়ে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছে । এইসব দেখে আমি পলাশীর মোড়ে আসলাম। এসে দেখি ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা টায়ারে আগুন ধরিয়ে রাস্তা ব্লক করে রেখেছে। আর সবাই একসাথে হয়ে শ্লোগান দিচ্ছে কিছুক্ষণ পর পর। আমার মধ্যে একধরনের এক্সাইটমেন্ট কাজ করতে লাগল। আগে কখনও এইরকম সামনাসামনি মিটিং মিছিল আন্দোলন দেখিনি ,টিভি,খবরের কাগজে পরতাম শুধু। একজন ফোনে বলতেছে ঢাকা মেডিক্যালের রাস্তা ব্লক করে রাখ আমরা পলাশী ব্লক করে রাখছি।  আমার মতো উৎসুক জনতারও অনেক ভিড় ছিল।

বিকাল ৪টাঃ
হলের সবাই ছুটাছুটি করা শুরু করলো।হলের নোটিশ বোর্ডের কাছে ভিড় জমাতে লাগল সবাই। শূনতে পেলাম সরকার মাত্র ঘোষণা দিয়েছে হল ভেকেন্ট করে দেওয়ার জন্য। আগামি ২ঘণ্টার মধ্যে হল ভেকেন্ট না হলে সেনাবাহিনী এসে সার্চ করবে, কাউকে পেলেই ধরে নিয়ে যাবে। আর সন্ধ্যা থেকে সারাদেশে কারফিউ জারি করা হয়েছে। রাস্তায় ৩জনের বেশী দেখলেই ধরে নিয়ে যাবে। আমি বুঝতেছিলাম না কি করবো। সবাই যে যার মতো খুব দ্রুত ব্যাগ নিয়ে হল থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। আমি  রুমে চলে গেলাম।গিয়ে দেখি ভাইয়ের রুমমেটরা সবাই চলে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে । সবাই আমাকে খুব আদর করত । নিজের ছোট ভাইয়ের মতো দেখত । পড়ালেখা থেকে শুরু করে যে কোন সমস্যা হলে কেউ না কেউ এগিয়ে আসত। আমাকে মেহরাব ভাই বলল তোর ভাইতো আজকে আসবেনা।আর তোর ভাইকে মোবাইলেও পাবিনা ,সব মোবাইলের নেটওয়ার্ক অফ করে দিছে সরকার।  এক কাজ কর তুই কামালের বাসা চিনিস?  কামাল আমার ভাইয়ের বন্ধু এবং আমাদের গ্রামের বড় ভাই, তারা আজিমপুরে থাকে। আমি বেশ কয়েকবার বড় ভাইয়ের সাথে তাদের বাসায় গিয়েছি । তাই মেহরাব ভাই আমাকে বলল তুই আজিমপুরে ওদের বাসায় চলে যা, যদি লাগে বল আমি তোকে দিয়ে আসি । আমি বললাম না আমি পারব। আমি দ্রুত একটা ব্যাগ গুছায়ে বের হয়ে পরি । রাস্তায় নেমে দেখি ভয়াবহ অবস্থা । কোন রিক্সা খালি নেই । এক ছেলে সাথে তার গার্ল ফ্রেন্ড খুব সম্ভবত ,রিক্সাওালাকে বলতেছে মামা আজিমপুর যাবেন । রিকশাওয়ালা সেই ভাব নিয়ে আছে । না মামা যাবনা । ঐ ছেলে রিকশাওয়ালাকে প্রথমে ধমক দিয়ে বলল যাবেন না কেন। পরে খুব নরম সূরে বলতেছে মামা প্লিজ চলেন । পারলে সে রিক্সাওয়ালার পায়ে ধরে বসে থাকে তাও রিকশাওয়ালা যাবেনা ।   আমি আর চেষ্টা না করেই হেটে রওয়ানা দিলাম। হাটতে হাটতে প্রায় ৩০ মিনিট পর কামাল ভাইয়ের বাসায় পৌঁছলাম। কিন্তু গিয়ে দেখি তাদের রুমে তালা দেওয়া । সম্ভবত তারা গ্রামের বাড়িতে গেছে। মোবাইল বের করে ফোন দিব তাও পারছিনা, নেটওয়ার্ক নেই। খুব চিন্তিত মনে হলে আসলাম। ইতিমধ্যে ২/১ জন ছাড়া সবাই চলে গেছে। আমি রুমে চলে যাই। অল্প কিছুক্ষণ পরেই সন্ধ্যা নেমে আসে। রুমে বসে বসে  গান শুনছিলাম। হটাত করেই ইলেক্ট্রিসিটি চলে যায়। হলে ইলেক্ট্রিসিটি যায়না কোনসময় । পরে বুঝতে পারলাম হলের সব ইলেক্ট্রিসিটির  লাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

রাত ৯টা : 
আমি অন্ধকার রুমে বসে আছি । খুব খিদে পেয়েছে কিন্তু নিচেও নামতে পারছিনা । হলের সব গেইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একটু পর পর সেনাবাহিনীর গাড়ি টহল দিচ্ছে সাইরেন বাজিয়ে। বারান্দায় বসে ছিলাম, ভয়ে রুমে চলে যাই।আমি ছোট বেলা থেকেই ভুত অনেক ভয় পেতাম , অন্ধকারে রাস্তায় বেরুতে ভয় লাগত। সেদিন আমি সম্পূর্ণ হলে একা , কোথাও কেউ নেই , নেই সামান্য আলো। সবগুলা রুম তালাবদ্ধ।মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই তাও অনেকবার ট্রাই করছিলাম যদি কারো মোবাইলে কল যায়।  সেদিন আমার ভুতের ভয় পাওয়ার কথা ছিল সবচেয়ে বেশী কিন্তু অবিশ্বাস্য কোন কারনে আমার ওইধরনের কোন ভয় কাজ করেনি। যদি সেনাবাহিনী এসে রুমে তালাস করে যদি আমাকে ধরে নিয়ে যায়,এইটা ভেবেই খুব ভয় পাচ্ছিলাম । দেহ কোষের হাইপোথ্যালামাস ব্রেইনকে বার বার পাকস্থলী শুন্যতার  সিগন্যাল পাঠাচ্ছে । ভয় , খিদে ২টা একসাথে । মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রচণ্ড খিদে লাগার কারনে ভয়টা কম কাজ করতেছিল । মস্তিষ্কে ভয়ের সিগন্যালের চেয়ে খিদের সিগন্যাল বেশী প্রাধান্য পাচ্ছিল। রুমের ভিতরে অনেক গরম তাই বারান্দায় একটু সাহস করে আসি। বারান্দায় বসে বসে দেখছিলাম কিছুক্ষণ পর পর গাড়ি ভর্তি আর্মি আসছে  আর এদিক ওদিক যাচ্ছে। আমি অন্ধকারে বসে শুধু তাকিয়ে ছিলাম। কিছুক্ষণ পর রুমে যাই ঘুমানোর জন্য। মোবাইলটা হাতে নিতেই অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটল, দেখি ৫টা মিসকল । একটা সিটিসেল নাম্বার থেকে। তারপর আমি অনেকবার ট্রাই করি কিন্তু কোনভাবেই নেটওয়ার্ক পাইনি। সেই ভূতুরে কলের আর অনুসন্ধান পাইনি। অনেক কিছু চিন্তা করতে করতে একসময়  গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পরি।

__________________________

মোবাইলে ১৫টা মিসকল উঠে আছে। তন্দ্রা মেয়েটার এই একটা স্বভাব , মোবাইল না ধরলেও সে কল করতেই থাকে।

-এতক্ষণ লাগে ফোন ধরতে ?
-একটা গল্প লিখছিলাম ।
-তোমার খালি এইসব আজাইরা গল্প লেখা। কেউ পড়ে তোমার গল্প?
-আমিতো কারো পড়ার জন্য গল্প লেখিনা । নিজের জন্য লেখি । আর কেই না পড়ুক একজনতো পড়বে।
-গল্প লেখা শেষ ?
-শেষ অংশটা বাকি । অবশ্য এইটা লিখব কিনা বুঝতেছিনা ।
-বাদ দাও লিখার দরকার নাই ।
-কালকে সাথে করে নিয়ে এসো।

এই তন্দ্রা মেয়েটা অদ্ভুত। ছোটবেলায় প্রত্যেক প্রবন্ধের নামকরনের সার্থকতা লিখতে হত। তন্দ্রার নামকরন সম্পূর্ণভাবে সার্থক। ওর সাথে কথা বললেই আমার ঘুম আসে ।মনে হয়  বিশাল এক গাছের ছায়ার নিচে আরামদায়ক কোন বেঞ্চেতে শুয়ে আছি । বাতাসে গাছের পাতা নড়ছে আর পাশে সমুদ্রের গর্জন ।

:::…শঙ্খনীল পাখি…:::

আমার প্রথম এবং শেষ প্রকাশিত কবিতা।ঢাকা সিটি কলেজের বিদায়দিনে আমরা যে টি-শার্ট করেছিলাম সেটাতে এই কবিতাটি লেখা ছিল ।মজার ব্যাপার  হল,আমি সব ফ্রেন্ডদের বলেছিলাম যে এইটা “হুমায়ন আহমেদ” এর লেখা ।সবাই খুব আগ্রহ নিয়েই কবিতাটি টি-শার্টে রাখার জন্য মত দিয়েছিল।সবাই জানে এই কবিতাটি “হুমায়ুন আহমেদ”-এর কবিতা। প্রিয় হুমায়ুন আহমেদ আপনার এই মিথ্যা কবিতার জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন ।

এইতো সেদিন ঝলমলে ভোরের সূর্য

আকাশে স্বপ্নের রঙিন ঘুড়ি ওড়িয়ে

ডানা মেলে ধরেছিল ঐ আকাশপানে।

দিবসের শেষ সূর্য

পশ্চিম সাগর তীরে

আজ অস্তগামী ।

পূর্বের আকাশ মেঘলা

বিষণ্ণ মনে হৃদয় বর্ষণ

ঝরিতেছে আজ বিদায় বেলা।

নাহি যেতে দিব হায়

বারে বারে শঙ্খনীল পাখি

বিষণ্ণ আকাশে ডানা ঝাপটায় ।। 

 

 

13567198_1031887593514819_7804049037171905506_n

অবাক নির্বাক

“এই গল্পের কোন ভুমিকা নেই
যেদিন অন্ধকারের রঙ হলুদ হবে
পশ্চিমে উড়ে যাবে বিষাদ আকাশ ।”
…………………………………………………………………………………………..
আমাদের পাজেরো খুব দ্রুত এগিয়ে চলছে। বাইরের প্রচণ্ড বাতাসে শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেছে , নিজেকে কেমন যেন সাপের মত মনে হচ্ছে। কেউ হটাৎ করে হাত দিলে ভয় পেয়ে যাবে।শরীরটা এত ক্লান্ত লাগছে যে হাতের ঘড়িতে কয়টা বাজে সেটা দেখারও শক্তি পাচ্ছিনা। পাশেই কামরুল চাচা, মিরা ভাবি,কনক ভাই বসে আছেন। কিন্তু কাউকে এখন ডাকতে ইচ্ছা করছেনা। কষ্ট করে ঘড়ি দেখার চেষ্টা করলাম ,একি ঘড়ি ৮টার ঘরে এসে থেমে আছে। ঘড়ির ব্যাটারিটা মনে হয় গেছে। আচ্ছা এখন সময় জানাটা কি খুব দরকার ? ক্লান্তি এমনভাবে ধরেছে কিছুই করতে ইচ্ছা করছেনা।যখন খুব ক্লান্ত থাকে শরীর তখন চোখ বন্ধ করতেও কষ্ট লাগে। সবাই চুপচাপ ,কোন কথা বলছেনা । মনে হয় আমার মতো সবারই একই অবস্থা। তবে খলিল চাচা কিছুক্ষন পর পর মোবাইলে কথা বলছেন। বাইরের প্রচণ্ড বাতাসে কিছু শুনা যাচ্ছেনা। আমরা যাচ্ছি আমাদের গ্রামের বাড়িতে কিন্তু কেন যাচ্ছি কেউ আমাকে বলেনি। আমাকে মনে হয় কেউ কিছু বলার প্রয়োজন মনে করছেনা।
গ্রামের বাড়ি পৌছালাম সকাল ৭টায়। গাড়ি থেকে নামতেই দেখি অনেক ভীর।এত ভীর কেন? গ্রামের বাড়ি আসা হয়না প্রায় দুই তিন বছর হবে। কিন্তু এত ভীর হবে কেন।এলাকায় কনক ভাই এর অনেক নাম ডাক। মিরা ভাবি এই প্রথম এসেছেন ওনাকে দেখার জন্য এত ভীর হতে পারে ।মিরা ভাবি অসম্ভব সুন্দরী। কিছু কিছু মেয়ে আছে যাদের এর থেকে বেশী সুন্দর হলে ভাল লাগেনা। বেশী সাজলে এদের আসল সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়, এরা হচ্ছে স্নিগ্ধ সুন্দর। এদের চেহারার মধ্যে একটা পবিত্র পবিত্র ভাব থাকে সব সময়।ইতিহাসের হেলেন অফ ট্রয়, মিশরের ক্লিওপেট্রা এদের পাশে মিরা ভাবির নামও থাকা উচিত।
আমরা ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে যেতে লাগলাম। বাড়ির সামনেও দেখি অনেক মানুষের জটলা। ব্যাপারটা একটু সন্দেহজনক। আরে এটা কে বিজয় না । অনেকদিন পর দেখা । ডাক দিলাম শুনতেই পেলনা। অনেক মোটা হয়ে গেছে। অনেকেই বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে।জেরিন ভাবির সাথে এইটা কে। আরে এইটাতো দেখি আসিফ। চেনাই যাচ্ছেনা, সেই পিচ্ছিকালে দেখেছিলাম। কতবার আমার কোলে হিসু করে দিয়েছিল এই ছেলেটা তার কোন হিসাব নাই। কিন্তু ওরাতো শুনেছিলাম সিলেটে চলেগিয়েছিল। আমরা আসব বলে কি আসছে। আমাদের আসাটা কি এত গুরুত্বপূর্ণ কিছু। কখনওতো এমন হয়নাই। হোয়াটস গোয়িং অন!!! বাড়ির উঠানে পা রাখতেই দেখি আমাদের দেখে সবাই কাঁদছে। আরে সবাই এমন করে কাঁদছে কেন। অর্পিতা খালাকে দেখা যাচ্ছে ,ওনাকেও অনেকদিন পর দেখলাম। প্রায় ৩ বছর হবে। খালাকে বললাম কি হয়েছে এখানে , তুমিও এমন করে কাঁদছ কেন। আমাকে না বললে আমি বুঝবো কি করে। একমাত্র আমি ছাড়া সবাই কাঁদছে । আমার শরীর এত ক্লান্ত যে আমি সামান্য নড়ার শক্তিও পাচ্ছিলাম না।
সবচেয়ে বড় কথা মা,বাবা কোথায়, ওনাদের দেখছিনা কেন। ঘরের ভিতরে যাওয়া দরকার। মা,বাবার কিছু হয়নিতো আবার। এইতো মা,বাবা দুজনই একসাথে আসছেন। কিন্তু এত জোরে জোরে মা অমিত আমিত বলে চিৎকার করছেন কেন। আমার কাছে এসেই ফিট হয়ে গেলেন। মার চোখ মুখে পানি দেওয়া হল। উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। বাবা কেবল অঝোরে কান্নাকাটি করছেন। মার পর বাবাও আমাকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। শেষ কবে বাবা আমাকে এভাবে জড়িয়ে ধরেছিলেন আমার ঠিক মনে নেই। বড় হওয়ার সাথে সাথেই বাবা মায়ের আদরের বহিঃপ্রকাশটা হারিয়ে যায়।
সবাই আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা। আমার গায়ে সাদা কাপর জরানো । ছোট একটা অন্ধকার জায়গায় শুইয়ে দিল আমাকে ।আমি জোরে জোরে চিৎকার করছি কিন্তু কেউ আমার কথা শুনতে পাচ্ছেনা। সব ভেঙ্গে উপরে উঠতে চাচ্ছি কিন্তু কিছুতেই আমি নড়তে পারছিনা। আমার উপর মাটি দিচ্ছে কেন সবাই। চিৎকার করে বাবাকে ডাকছিলাম। আমার দম বন্দ হয়ে আসছে। বাবা শুনছেনা কেন,এত নিষ্ঠুর হয়ে গেলে কেন সবাই। আমি কেবল প্রাণপণে চিৎকার করছি,সমস্ত শক্তি দিয়ে শুধু চিৎকার করছি।
———————————
প্রতিদিনের মত আজকেও সকালে বাবা খবরে কাগজ পড়ছেন আর হাতে চিনি ছাড়া চা । এই জিনিসটা বাবা কিভাবে গলাধঃকরণ করেন বুঝিনা।নিশ্চয় খুব বাজে। বাবাকে দেখে কিন্তু তা মনে হয়না। ওনি বেশ মজা পান বলে আমার ধারনা। ঘড়িতে চোখ রাখতেই দেখি ৯টা বাজে।আরেকটু পর ঘুম ভাঙ্গলে খবরই ছিল। । আজ অনেকদিন পর তন্দ্রার সাথে দেখা হবে।১০ টায় দেখা করার কথা, কিছুতেই দেরি করা যাবেনা।একটু দেরী করলেই মেয়েটা রাগ করে।

সুইসাইড নোট

রাত ১১টা , সুইসাইডের জন্য উপযুক্ত সময়।
সুইসাইডের জন্য সবচেয়ে সহজ পথ হচ্ছে ঘুমের ওষুধ। অ্যামেরিকায় প্রেসক্রিপশন ছাড়া কাউকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়না। কিন্তু বাংলাদেশে যে কেউ চাইলেই যত ইচ্ছা ঘুমের ওষুধ কিনতে পারে।সবার ধারনা গভীর ঘুমের মধ্যে মারা গেলে কোন কষ্ট হবেনা।এই জন্যই সবাই সুইসাইডের মাধ্যম হিসাবে ঘুমের ওষুধকেই বেছে নেয়।
সুইসাইডকে এক সময় ক্রাইম হিসাবে গণ্য করা হত।অনেক আগে একবার লন্ডনে হেনরি চার্চিল নামে ৬০বছরের এক বেক্তি গুলি করে সুইসাইড করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত আহত হয় । পরে তাকে ৬ মাসের জন্য জেলে পাঠানো হয় সুইসাইড এটাম্পট করার অপরাধে।
এই মুহূর্তে অবন্তির হাতে ১৬টা রেস্টরিল । এর আগেও সে কয়েকবার ট্রাই করেছে। কিন্তু সাহসের অভাবে পারেনি। এইবার ফাইনাল। সে মোটামুটি একটা রিসার্চ করে ফেলছে। ১৬টা রেস্টরিল খাওয়ার পর তার হাতে সময় থাকবে মোট ২৫ থেকে ৩০ মিনিট। সে কি কি করবে সব কিছুই অনেক আগে থেকেই প্ল্যান করা।
এখন ঘড়িতে ঠিক ১১টা বাজে। অবন্তি সবগুলো ওষুধ খওয়ার জন্য হাতে নিল । তার ভিতরটা কেমন ধুক ধুক করে উটল। হটাত বড় কোন ঘটনার সম্মুখীন হলে রক্তে এপিনেপ্রিন খুব বেশী পরিমাণে নিঃসৃত হতে থাকে এতে হার্টবিট এবং ব্লাড প্রেসার বেরে যায়। অবন্তির হাত কাঁপছে।কাঁপা কাঁপা হাতে সে সবগুলো ওষুধ খেয়ে নিল । বাহিরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে।অবন্তি প্রথমে ঘরের বাতি নিবিয়ে দিল। ঘরের মধ্যে শুধু সামান্য মোমবাতির আলো। হাতে মাত্র ২৫মিনিট সময়। সে প্রথমেই নাতাসা বেডিংফিল্ডের পকেট ফুল অফ সান্সাইন গানটা ছাড়ল । ঠিক তার পরে শুনবে এডেলের সামওয়ান লাইক ইউ এবং সবশেষে জন ডেনেভারের কান্ট্রি রোড । আগে থেকেই তার সবচেয়ে পছন্দের গানগুলো ঠিক করে রেখেছিল। পকেট ফুল অফ সান্সাইন গানটি বেজে চলছে।
Take me away
A secret place
A sweet escape …
অবন্তি জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখছে আর গান শুনছে । জীবনের শেষ বৃষ্টি,শেষ মুহূর্ত ভাবতেই কেমন জানি লাগছে। তবে এখন অবন্তিকে অনেক স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। দেখে কেউ বুঝতেও পারবেনা একটু আগেই সে ১৬টি ঘুমের ওষুধ খেয়েছে। একটা মানুষের মৃত্যু মিনিমাম ৬জনকে তীব্রভাবে এফেক্ট করে । অবন্তি চিন্তা করছে এই ৬জন কে কে হতে পারে। তার বাবা, মা। বাবা থাকেন অ্যামেরিকা আর মা লন্ডন। ৩য় জন তার ফুফি ।অবন্তি তার ফুফির সাথেই থাকে। ৩ জন পাওয়া গেছে। আর একজনের ব্যাপারে সে নিশ্চিত নয়। অমিত , অবন্তির ফুপির বাসায় ভাড়া থাকে । অবন্তি অমিতকে খুব পছন্দ করে কিন্তু সেটা অমিতকে কোনভাবেই বলতে পারেনা । অবন্তি খুব ইন্ট্রোভার্ট মেয়ে। অবন্তি এইসব চিন্তা বাদ দিয়ে এখন সে শেষ মুহূর্তগুলোকে এঞ্জয় করার চেষ্টা করছে। বৃষ্টির শব্দের সাথে সাথে কান্ট্রি রোড গানটা শুনতে অসম্ভব ভাল লাগছে,নতুন এক ধরনের ছন্দ তৈরি হয়েছে। গানটি শেষ হলেই অমিতের জন্য একটা চিরকুট লিখতে হবে।
রাত ২টা। অবন্তিকে একটা প্রাইভেট হাসপাতালে নেওয়া হল । অমিতের হাত পা কাঁপছে। সে কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছেনা ।ঐ হাস্পাতালের ডিউটি ডাক্তার জানায় বেসরকারি কোন হাসপাতালে পয়জনের রুগিকে ওয়াশ করানো হয়না। অবন্তির মুখে অক্সিজেন লাগানো আছে। অমিত আর অবন্তির ফুফি এম্বুলেন্সে করে অবন্তিকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যালে খুব দ্রুত চলে গেল।একটা ট্রলিতে অবন্তিকে শুইয়ে রাখা হল। অমিত দ্রুত একটা টিকেট আনতে গেল ।তার সাথে হাসপাতালের একজন ওয়ার্ড বয় ।টিকেট কাউন্টারের লোক বসে বসে ঝিমাচ্ছিল। প্রথমে অমিতকে দেখে সে খুব বিরক্ত হল । পরে সে রুগীর নাম জিজ্ঞাসা করল । অমিত হাপাতে হাপাতে বলল ভাই একটু তারাতারি করেন । কাউন্টারের লোক তার কথায় কোন পাত্তা দিল বলে মনে হল না। পরে তাকে রুগীর বয়স, ঠিকানা ,রুগী তার সম্পর্কে কি হয় ইত্যাদি জিজ্ঞাস করল।অমিতের ইচ্ছে করছে বলতে , রুগী মারা যাচ্ছে এইদিকে এখন এইসব লেখার কি কোন দরকার আছে । কিন্তু সে বলতে পারেনি। ওয়ার্ড বয় বলল টিকেট নিয়ে ১১৫ নাম্বার রুমে চলে যান, ওইখানে ডাক্তারের কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন লিখে নিয়ে আসেন। ডাক্তারের বয়স খুব অল্প । হেরিসনের ইন্টারনাল মেডিসিনের মোটা বইটি পড়তে পড়তে টেবিলে ঘুমিয়ে পরেছে। ঘুম থেকে উঠে সে চোখে মুখে পানি দিয়ে আসল । ডাক্তার অমিতকে জিজ্ঞাসা করল কতক্ষন হয়েছে আর কি ওষুধ খেয়েছে। অমিত কিছুই বলতে পারেনি।পরে জিজ্ঞাসা করল রুগী আপনার কি হয়। অমিত বলল আমার পরিচিত। ডাক্তার খুব বিরক্ত হয়ে আর কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। প্রেসক্রিপশন পাওয়ার পর ২জন লোক অবন্তিকে ১২৭ নাম্বার রুমে নিয়ে গেল। অমিতও সাথে সাথে গেল। রুমের ভিতরে একটা বড় ড্রাম আর কয়েকটি পাইপ ছাড়া আর কিছুই নেই। রুমটা দেখতে অনেকটা গ্যারেজের মতো লাগছে। অবন্তি তখনও মাঝে মাঝে একটু নড়তেছিল। একজন এসে একটা দড়ি দিয়ে অবন্তির পা দুটা বেঁধে দিল আর হাত ২টা আলাদা আলাদা করে ট্রলির সাথে বেঁধে দিল। লবন পানি দিয়ে কিছুক্ষণ পাকস্থলী খালি করার চেষ্টা করা হল।অবন্তি তার অবচেতন মনেই সমস্ত শক্তি দিয়ে হাত পা ছোড়াছুড়ি করার চেষ্টা করছে ঠিক যেভাবে কোরবানির সময় একটা পশু ছটফট করে। ওয়াশ শেষে ঐ ২লোক ৫০০টাকা করে চাচ্ছে। অমিতের হাতে এত টাকা নেই । কি করবে কিছুই বুঝতে পারছেনা। শেষে ওয়ার্ড বয় বলল আমি দিয়ে দিচ্ছি আপনি আমাকে পরে খুশি করে দিয়েন। সেখান থেকে অবন্তিকে নিয়ে যাওয়া হল ৭তলায়।৭তলায় ২টা ওয়ার্ড, ওয়ার্ড-এ আর ওয়ার্ড-বি। কোন ওয়ার্ডেই সিট ফাকা নেই। বারান্দাও ভর্তি রুগীতে ।২ ওয়ার্ডের মাঝামাঝি বারান্দার এক কোনে সেই ওয়ার্ড বয়টি জায়গা মেনেজ করে দিল। ভর্তি করার সময় ৭তলা থেকে প্রেসক্রিপশনের ডান পাশে পুলিশ কেইস লেখা বড় একটা সিল মেরে দিল। নার্স এসে কয়েকটা চারকল নিউট্রলাইজার ইনজেকশন দিল যাতে ড্রাগ খুব দ্রুত নিউট্রলাইজ হতে পারে । আর একটা ইন্টাভেনাস ফ্লুয়িড সেলাইন দিয়ে রাখল। বলে গেল এই সেলাইন শেষ হলে যেন ওয়ার্ডে গিয়ে জানিয়ে আসে।অবন্তির ফুফি পাশে বসে বসে কাঁদছে আর অমিত তাকিয়ে আছে অবন্তির দিকে। কি এমন কারন যার কারনে সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চায় মেয়েটি। একবার অবন্তি একটা নুড়ি পাথর দিয়ে বলেছিল জানেন একটা ছেলে পেঙ্গুইন যখন আরেকটা মেয়ে পেঙ্গুইনকে পছন্দ করে তখন আসেপাশের সবচেয়ে সুন্দর নুড়ি পাথরটা সেই মেয়ে পেঙ্গুইনের জন্য খুঁজে নিয়ে আসে।অমিত তখন শুধু বলেছিল বাহ তুমিতো অনেক কিছু জান দেখছি।
ওয়ার্ড বয় অমিত কে বলল ভাই আমাকে বিদায় দিয়ে দেন। অমিত কি করবে বুঝতে পারছেনা। তার হাতে এই মুহূর্তে কোন টাকা পয়সা নেই। তন্দ্রাকে ফোন করতে হবে । তাকে বললেই সে টাকা নিয়ে হাজির হবে।
-হ্যালো তন্দ্রা
-হুম বল
– তুমি কিছু টাকা নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল চলে আস। (তন্দ্রা খুব বিস্ময়ের এবং আতঙ্কের সাথে অনেকগুলা প্রশ্ন করা শুরু করল )
– কার কি হয়েছে ? তুমি কোথায় ?কি হয়েছে ? (মেয়েটি অল্পতেই অস্থির হয়ে যায় )
– সব পরে বলবো , তুমি আস । আর, চিন্তার কিছু নেই আমার কিছু হয়নি।
একটা স্যালাইন শেষ হয়ে গেছে। ওয়ার্ডে গিয়ে দেখল আগে যারা ডিউটিতে ছিল তারা নেই।সবাই নতুন, সেকেন্ড শিফট শুরু হয়েছে। কাগজ দেখিয়ে অমিত বলল এই পেশেন্টের স্যালাইন শেষ হয়ে গেছে আরেকটা স্যালাইন লাগবে। ওরা কিছুক্ষণ কাগজ দেখে বলল এই রুগীতো আমাদের ওয়ার্ডের না।সে অবাক হয়ে বলল ভর্তিতো এইখান থেকেই করা হয়েছে। ঐ লোক তখন বলল এইখানে ৭১২ লেখা ওইটা পাশের বি-ওয়ার্ডের আন্ডারে। বি- ওয়ার্ডের ওরা বলল চিকিৎসাতো এ-ওয়ার্ডের আমারা আবার কিভাবে শুরু করবো, ওদের গিয়ে বলেন। অমিত কি করবে বুঝতে পারছিলনা । বি- ওয়ার্ডের সামনে বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়েছিল আর তখনি তন্দ্রাকে দেখেই একটু সস্থি পেল। তন্দ্রা কিভাবে কিভাবে যেন সবকিছু ঠাণ্ডা মাথায় ঠিক করে ফেলে। রূপবতী মেয়েদের সব কাজেই তাদের রুপের একটা ছোঁয়া থাকে। আধা ঘণ্টার মধ্যে তন্দ্রা সবকিছু মেনেজ করে ফেলল। অবন্তির শরীরে ধীর গতিতে স্যালাইন চলতে লাগলো। ডাক্তার এসে বলে গেলেন সকাল না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছেনা , সি ইস ইন ডেঞ্জার নাউ।
অমিত আর তন্দ্রা কিছুক্ষনের জন্য বাইরে বের হল । সমস্ত শহর ডুবে আছে অন্ধকারে। কালবৈশাখী লন্ডবন্ড করে দিয়ে গেছে সব। শহরটাকে গহীন অরণ্যের মতো মনে হচ্ছে। তন্দ্রা অমিতের হাত খুব শক্ত করে ধরে আছে। মাঝে মাঝে হালকা বাতাস এসে তন্দ্রার চুল এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে । ঝড়-তুফানের ঠিক পরের সময়টা হচ্ছে পবিত্র সময় । প্রকৃতি খুব শান্ত এবং পবিত্র থাকে । এই পবিত্র সময়ে হয়তো কোথাও কোন অমিত-তন্দ্রা হেটে চলছে ঘুমন্ত নগরীর ফাঁকা রাজপথে , হয়তো কোথাও কোন অবন্তি লিখে চলেছে তার সুইসাইড নোট।

জোছনা জোয়ার

হটাৎ গভীর ঘুম ভেঙ্গে গেলে দ্বিধায় পরতে হয়। একবার মনে হচ্ছে হলের সিটে শুয়ে আছি আবার মনে হচ্ছে বাসায় শুয়ে আছি। ঘুম সম্পূর্ণ ভাঙ্গার ঠিক আগের সময়টায় এইরকম হয়। চোখ খুলতেই দেখি অনেক দিনের পরিচিত সেই ছাদ,জানালা,দরজা,শৈশবের সেই রুম। দীর্ঘদিন না আসার কারনে এই স্মৃতিতে অনেকটা ধূলা জমে গেছে।গতকাল রাতে হুট করেই চলে আসছি গ্রামের বাড়িতে। বিশাল এই বাড়িতে আমি এখন একা । জানালার কাঁচ ভেদ করে সূর্যের আলো ঠিক আমার মুখের উপর পরেছে । কাচের প্রতিসরণের কারনে সূর্যের আলোটা অনেক কোমল লাগছে। সূর্যের আলোর দিকে সোজা তাকানো যায়না কিন্তু প্রতিসৃত আলোর দিকে তাকালেই একটা আদর আদর ভাব চলে আসে ।মনে হচ্ছে অনেকদিন পর পরম মমতায় কেউ আমায় আদর করে দিচ্ছে ।
অনেকদিন পর গ্রামের রাস্তায় হাঁটছি। আত্মীয়স্বজন কেউ জানেনা আসছি না হয় সকাল বেলায় অনেকেই চলে আসত। পথে হটাৎ তপন কাকার সাথে দেখা। সংসারের হাল টানতে টানতে বেচারা অনেক শুকিয়ে গেছে।
-কেমন আছ অমিত?
– জি কাকা ভাল । আপনি কেমন আছেন?
-গরীব মানুষের আর ভাল থাকা ! কবে আসছ, আর সাথে কে কে আসছে ?
-আমি একাই আসছি,গতকাল রাতে। হটাত আসতে ইচ্ছা করল।
– তোমরা বাবা আমাদেরতো ভুলেই গেছ। আচ্ছা , এ হচ্ছে প্রান্থ । আমার ছেলে। ভাল নাম প্রান্থ ভোমিক।
-আমি মুচকি হেসে বললাম খারাপ নাম কি ?
– কাকাও হাসলেন। ক্লাস থ্রিতে পরে। খুব ভাল ছাত্র।গত বছর ফার্স্ট হয়েছে।
ওনার সাথে গল্প শেষ করে আবার হাটা শুরু করলাম। হাটতে হাটতে আমাদের স্কুলে চলে আসলাম। কত পরিবর্তন হয়েছে এই স্কুলটার। আমি যেন এখনও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি অনিমেষ স্যার নিচতলার শেষ ক্লাসরুমটায় আমাদের অঙ্ক করাচ্ছেন। অদ্ভুত সব স্মৃতি আমার সামনে এখন ভাসছে। স্মৃতিগুলো চলমান হয়ে গেছে আর আমি স্থির হয়ে আছি। এই মাঠে আমরা কত ফুটবল,ক্রিকেট,হ্যান্ডবল খেলেছি।একবার আমরা আমাদের সিনিওর ব্যাচকে হারিয়ে হ্যান্ডবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম।কাপটা মনে হয় হেডস্যারের রুমে এখনও আছে।আরেকবার মনে আছে বৃষ্টির দিনে ক্লাস হয়নাই তাই সবাই ফুটবল খেলতে চলে আসলাম পাশের কলেজ মাঠে।সম্পূর্ণ মাঠেই বালু ছিল।মাটের মধ্যে কে জানি বালু দিয়ে উঁচু করে গোলপোষ্ট দিয়ে রাখছে। আমি দৌড়ায় গিয়ে ভাবলাম ঐ বালুর পোষ্টে কিক করবো কিন্তু ভিতরে একটা আস্ত ইট ঢোকায় রাখবে কে জানতো।সাথে সাথে পায়ের চামড়া ছিলে রক্ত বের হয়ে গিয়েছিল। তারপরও সেদিন ফুটবল খেলেছিলাম।
এইযে এই বিল্ডিংএর ছাদে একবার কদম ফুলের  পাপড়ি ফেলার পর ছোট বলের মতো যেটা থাকে ওইটা দিয়ে ফুটবল খেলছিলাম ।ঐ ছাদে কোন রেলিং ছিলনা। এর জন্য এক স্যার আমাদের তিন জনকে বেত দিয়ে ইচ্ছামতো মেরেছিলেন।এর মধ্যে এক ফ্রেন্ড ছিল সাদা চামড়ার,শহুরে ছেলে। ওর জন্য খুব মায়া হচ্ছিল। বেচারা খেলতে চায়নি আমি তাকে জোর করে নিয়ে এসেছিলাম। লজ্জায়,রাগে লাল হওয়ার কথা শুনেছি কিন্তু কষ্টে কেউ লাল হয়ে যায় সেদিন দেখেছিলাম।ব্যাথায় বেচারার চেহারা থেকে রক্ত বেরিয়ে আসবে এমন অবস্থা ।ঐ স্যার আমার অনেক পছন্দের ছিল,আমাকেও অনেক পছন্দ করতেন ।নিজের ছেলের নাম রেখেছিলেন আমার নামের সাথে মিল রেখে।
এই যে টিনের ক্লাস রুমটা দেখা যাচ্ছে। ঠিক কোন ক্লাসে ছিলাম ঐ রুমটায় মনে নেই।ছোট একটা ঘটনার কথা মনে আছে। ঐদিন ক্লাসে স্যার আসে নাই, কিসের যেন মিটিং ছিল। আমি আর নাহিদ নামের এক ফ্রেন্ড কিছু একটা নিয়ে মারামারি করছিলাম। মাঝখান থেকে স্বপন নামের এক ফ্রেন্ড গিয়ে স্যারের কাছে নালিশ করে আসলো আমাদের নামে। ঐ স্যার এমনেই খুব রাগি , খিটখিটে মেজাজের।স্যার এসে ২জনকেই  ইচ্ছামত মারল,আমার লাইফের সবচেয়ে কঠিন মাইর খাওয়া ছিল এইটা।
অনেক স্মৃতি এই স্কুলটায়। এই যে কদম গাছ। আমার ছোট বেলা থেকেই প্রিয় ফুল ছিল কদম। বিশেষ করে বৃষ্টিতে ভেজার পর কদম ফুলগুলোকে অসম্ভব সুন্দর লাগত। কদম ফুল দিয়ে ঢিল ছুড়াছুড়ি করা,ক্লাসের বারান্দায় ফুটবল খেলা কি মজার দিনগুলাই না ছিল!! এই কদম গাছের পাশেই আমরা একবার একটা চড়ুই পাখি কবর দিয়েছিলাম। তখন আমরা ক্লাস ফাইবে পড়ি। রাতে অনেক ঝড়-তুফান হয়েছিল। পরেরদিন স্কুলে গিয়ে দেখি ক্লাসের সামনে একটা চড়ুই পাখি পরে আছে। কয়েকজন ফ্রেন্ড মিলে দেখলাম পাখিটা মারা গেছে। মন অনেক খারাপ হল আমাদের।সিদ্ধান্ত নিলাম এটাকে কবর দিব। পাশের একটা টেইলারসের দোকান থেকে ছোট একটা সাদা কাপড় মেনেজ করল একজন। পরে খুব যত্ন করে একটা গর্ত করলাম কদম গাছের পাশে। মৃত পাখিটাকে কবর দিলাম আমরা।কবর দেওয়ার পর জানাযাও পড়া হল। আমাদের মধ্যে একজন হুজুর টাইপ ছেলে ছিল যে প্রতি এসেম্বলিতে কোরআন তেলাওয়াত করত,নাম দেলোয়ার।দেলোয়ারই জানাযা পড়িয়েছিল । এসেম্বলির কথা মনে করাতে স্কাউটের কথা মনে পরে গেল। স্কুলের স্কাউট দলের ফিল্ড কমান্ডার ছিলাম আমি। সবচেয়ে সুখময় স্মৃতি ছিল একবার আমাদের স্কুলে যখন মন্ত্রী এসেছিল। আমি সম্পূর্ণ মাঠ কোচকাওয়াজ করে যখন মন্ত্রীর সাথে হ্যান্ডসেক করলাম মন্ত্রী আমাকে বললেন অনেক কষ্ট করেছ ,ভাল লেগেছে। মন্ত্রীর সাথে কথা বলতে পেরে নিজেকে কত ভাগ্যবান মনে হয়েছিল তখন, হা হা।
একটু পরেই এক ফ্রেন্ডের সাথে দেখা,নাম অনিক। ও আমাকে তুমি তুমি করে বলছে।অথচ আমরা একসাথে কত খেলাধুলা করেছি, মারামারি করেছি। আমাকে কি বলে ডাকতো সময়ের ব্যবধানে ও এখন সেটাই ভুলে গেছে।এইরকম অবস্থায় অনেক সময় পরতে হয়।দেখা গেছে অনেকদিন পর একজনের সাথে দেখা, আমি ভুলে গেছি তাকে তুই নাকি তুমি করে ডাকতাম।আবার এমনও হয় চেহারা পরিচিত কিন্তু সে সমবয়সী নাকি সিনিওর এইটা মনে করতে পারছিনা।গ্রামে গেলে আমার ক্ষেত্রে এইটা বেশী হয়। তখন খুব সাবধানে কথা বলতে হয়। তখনকার অতিসাবধানী কথাগুলো অনেকটা এইরকম হয়।
কি অবস্থা,দিনকাল কেমন চলছে, অনেকদিন পর দেখা,আজকে খুব গরম পড়ছে এইটাইপ কিছু বাক্য। এই টাইপ কথাগুলা তুই,তুমি,আপনি সবার সাথেই যায়।যদিও এইভাবে এদের সাথে বেশীক্ষণ কথা বলা যায়না।তখন আচ্ছা ঠিক আছে পরে কথা হবে এখন যাই একটু কাজ আছে , এইসব বলে কেটে পড়তে হয়।
সন্ধ্যা হয়েছে, আমি দাড়িয়ে আছি একটা ব্রিজের উপর। আমাদের গ্রামের একমাত্র ব্রিজ ,তিতাস নদীর উপর। যদিও এখানে নদীটার দীর্ঘ খুবই কম। এই ব্রিজ হওয়ার আগে আমরা নৌকা দিয়ে নদী পারাপার হতাম। আমার নানার বাড়ি ছিল পাশের গ্রামে। ভাল না লাগলেই চলে যেতাম। নৌকা পার হতে লাগত মাত্র একটাকা। এই নৌকা পারাপার করে অনেকের সংসার চলত। ব্রিজ হওয়ার পর সব নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।বেচারা মাঝিরা বিপাকে পরে। সন্ধার পর ব্রিজের জায়গাটা আমার খুব প্রিয় ।বিশেষ করে যখন চারপাশ নিশ্চুপ থাকে, নদীর পার থেকে যখন হাল্কা ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে যায় আর যখন আকাশে জোছনা থাকে। কোন এক অদ্ভুত কারনে পছন্দের সবকটাই আজকে একসাথে পেলাম।একেবারে খাপে খাপ পঞ্চুর বাপ।
একটা মেয়ে একটু দূর থেকে হেটে আসছে। মেয়েটির চেহারা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছেনা। মনে হচ্ছে মেয়েটা অসম্ভব রুপবতি। অসম্ভব রুপবতি মেয়েদের চেহারা জোছনার আলোয় অস্পষ্ট দেখায়। মেয়েটি আরেকটু কাছে আসতেই চেহারা স্পষ্ট হয়ে উঠল।খুব চেনা একটু মুখ।এখানে তার আসার কথানা । আমি খুব অবাক হয়েছি, আসলেই খুব অবাক হয়েছি। এইরকম অবাক জীবনে খুব বেশী হয়নি কিন্তু সেটা এই মুহূর্তে তার কাছে প্রকাশ করা যাবেনা।খুব কাছের মানুষকে অবাক করানোর মতো আনন্দ খুব কমই পাওয়া যায়। আমি তাকে এই মুহূর্তে সেই আনন্দ পাওয়া থেকে বঞ্চিত করতে চাই।তার প্রতি আমার অনেক অভিমান জমা আছে।
– কেমন আছ ?
-ভাল । তুমি কেমন আছ ?
– অবাক হওনি আমি এসেছি?
– আমি উত্তর না দিয়ে বললাম,তোমাদের না কানাডা চলে যাওয়ার কথা?
-আজকে ২৮’এপ্রিল ।
-হুম ।
– শুভ জন্মদিন।
– তুমি মনে রাখবে এইটা আশা করিনি।
-মানুষ অনেক কিছুই আশা করেনা তারপরও পেয়ে যায়। আবার অনেক কিছু আশা করেও পায়না।
তন্দ্রার পরশু সপরিবারে কানাডা চলে যাওয়ার কথা। সেটা শুনার পর আমি গ্রামে চলে আসি । অনেক মন খারাপ হলে আমিএইখানে চলে আসি।তন্দ্রা ঢাকা থেকে চলে আসবে ভাবিনি। কেন আসছে জানিনা।কিছু জিনিস আজানা থাকাই ভাল।
আমি আর তন্দ্রা বসে আছি নদীর পারে। আমাদের মাথার উপরে স্নিগ্ধ জোছনা। দুজনেই চুপচাপ। তন্দ্রা আমার হাত শক্ত করে ধরে আছে। সে শব্দ না করে কাঁদছে । শব্দ না করে কাঁদতে পারা এক ধরনের গুন। অসম্ভব রূপবতী মেয়েদের অনেক গুন থাকে। সব কাজেই তাদের রুপের একটা ছোঁয়া রেখে দেয়। আমি চেয়ে আছি জোছনার দিকে। জোছনার আলোর অনেক অদ্ভুত ক্ষমতা থাকে, কেউ হাজার কষ্ট নিয়েও যদি জোছনার আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে, যতক্ষণ তাকিয়ে থাকবে কষ্টগুলো জোছনার আলোর নীল রঙের সাথে মিশে যাবে, হাল্কা হয়ে উড়ে বেড়াবে। আমাদের দুজনের কষ্টগুলো জোছনার আলোর সাথে মিশে যাচ্ছে।আর আমরা ভেসে যাচ্ছি জোছনা জোয়ারে ।
“গঙ্গার ও পারে ঐ নতুন চাঁদ,
আর এপারে তুমি আর আমি,
এমন সমাবেশটি অনন্তকালের মধ্যে কোনোদিন ই আর হবেনা “
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে হয় এমন কোন দৃশ্যের কল্পনা করেই লাইনগুলা লিখেছিলেন।

এলোমেলো ভাবনা

প্রত্যেক মানুষই আলাদা , প্রত্যেকটা মানুষের নিজস্ব কিছু ভাবনা,ভাললাগা আছে।  এর মধ্যে হয়তো কারো সাথে কিছু বা অনেকটা মিলে যেতে পারে। ২টা মানুষ একসঙ্গে থাকতে হলে তাদের প্রত্যেকটা জিনিস মিল থাকতে হবে এমন কোন কথা নেই,তাদের সব পছন্দ-অপছন্দ,ভাল লাগা খারাপ লাগে মিলতে হবে এমন নয়। কারো সাথে হয়তো গল্প করতে খুব ভাল লাগে, কারো সাথে খেলতে , কারো সাথে ঘুরতে , কারো সাথে কাজ করতে । একটা মানুষের সবকিছুই ভাল লাগবে এমনটি আশা করাও বোকামি। তবে হ্যাঁ, ঐ মানুষটার খারাপটা আমি মেনে নিতে পারবো কিনা সেটাই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে ৩টা জিনিস খুব খুব গুরুত্বপূর্ণ।  একসেপ্টেন্স, আন্ডারস্ট্যান্ডিং , সেক্রিফাইস

একসেপ্টেন্স-  ২টা মানুষ একসাথে ভাল থাকার প্রথম ফ্যাক্টর হল একসেপ্টেন্স। কোন মানুষই পারফেক্ট হবেনা এইটা মেনে নেওয়া। যা আছে  তার মধ্যেই নিজের সুখ খুঁজে নেওয়া। হয়তো কেউ একটু কম সুন্দর হবে ,কেউ একটু কম লম্বা হবে,কারো টাকাপয়সা কম থাকবে। এইরকম অনেক কিছু আছে যেগুলা ঐ মানুষটার কম থাকতে পারে আবার বেশী থাকতে পারে, পজেটিভ বা নেগেটিভ । হ্যাঁ, ঐ মানুষটাকে গ্রহণ করার আগেই এইসব বিবেচনা করতে হবে। সব কিছু আগে যাচাই বাছাই করা যাবে যে তাও না , আফটারঅল মানুষতো কোন পণ্য নয়। আমাদের একটা বড় সমস্যা হল আমারা আমাদের চাওয়া-পাওয়া অন্যদের সাথে কম্পেয়ার করি। এইটা আমাদের সুখকে ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়। আরেকজনের এই জিনিসটা আমার থেকে ভাল এই একটা চিন্তাই যথেষ্ট নিজের সুখকে ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত করার জন্য।
“If we compare our happiness with others,happiness will walk away slowly”

আন্ডারস্ট্যান্ডিং–  যেমন একজন মুভি দেখতে খুব পছন্দ করে আরেকজন কবিতা পড়তে। ২জনের পছন্দ ২দিকে।একজন কমেডি খুব পছন্দ করে আরেকজনের কমেডি ভাল লাগেনা।একজন কম কথা বলে আরেকজন বেশী। এইগুলা সমস্যা হবেনা তখনই যদি  জিনিসগুলাকে মেনে নিতে শিখে , একজন আরেকজনকে বুঝতে শিখে।

সেক্রিফাইস- খুব গুরুত্বপূর্ণ যেটা থাকা বা না থাকার কারনে সম্পর্ক সুন্দরও অথবা নষ্ট  হয়ে যায়। সম্পর্কের মধ্যে ইগো-এর অস্তিত্ব কোন ভাবেই রাখা যাবেনা ,না হলে কোন না কোন সময় সম্পর্কটা ঝাপসা হয়ে যাবে। সম্পর্কের একটা বড় প্রশ্ন “আমিই কেন সেক্রিফাইস করবো?!!”। সম্পর্কের মধ্যে এই প্রশ্নটাই ভয়ানক। কোন কোন সময় হেরে যাওয়া মানেই জিতে যাওয়া, না হয় একসময় মানুষটা জিতে যাবে হেরে যাবে সম্পর্কটা।

এই ৩টা ফ্যাক্টরকে কোনভাবেই ছাড় দেওয়া যাবেনা। ৩টার বেলেন্স রাখতে হবে।কোন একটা কম হলে আরেকটা খুব বেশী হতে হবে।

সম্পর্কের মধ্যে প্লেফুল সম্পর্কগুলাই ভাল। খুনসুটি,দুষ্টামি,মারামারি(অবশ্যই সিরিয়াস না :P) ,এতে করে সম্পর্ক বোরিং হয়না। সম্পর্ক বোরিং হয়ে গেলে খুব সমস্যা। বেশী ভালবাসাও ভাল না আবার ভালবাসা কম হলেও হবেনা।
একসাথে থাকতে গেলে ভুল বোঝাবুঝি,রাগারাগি,মান-অভিমান এইগুলা কম বেশী হবেই। কিন্তু একটা জিনিস কখনও ভাঙ্গা যাবেনা সেটা হল বিশ্বাস। এইটা এমন এক জিনিস যা একবার ভেঙ্গে গেলে পড়ে জোড়া লাগতে পারে কিন্তু সেটা অনেকটা ভাঙ্গা পা-এর মতো কাজ করবে। চলবে ঠিকই কিন্তু স্বাভাবিকের মতো নয়।

আরেকটা জিনিস হল, একটা মানুষকে চিনতে হলে অনেকটা সময়ের প্রয়োজন। একসাথে না থাকা হলে চেনা অনেক কঠিন। কোনমানুষকে সম্পূর্ণভাবে সারাজীবনেও চেনা সম্ভব নয়।

কোন কিছু গ্রহণ করিবার আগে অনেকবার চিন্তা করিয়া লওয়া উচিত কিন্তু গ্রহণ করিবার পর চিন্তা করা কোনভাবেই উপযুক্ত নয়। এইটা মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম যে , কোন কিছু অর্জন করিবার পর সেটার আকর্ষণ পূর্বের ন্যায় বিরজমান থাকেনা কিন্তু সেই আকর্ষণ যদি স্থানচূত হয় বা প্রতিস্থাপিত হয় তাহা হয়লেই জীবনের ছন্দ পতন ঘটিবে, সম্পর্ক রসহীন হইয়া পরিবে। অর্জন করার চেয়ে রক্ষা করা সুকঠিন।

 

এই কথাগুলা একান্তই আমার মতামত এবং এইগুলা আমি আমাকেই বলতেছি।
তাবলীগের একটা জিনিস আমার খুব ভাল লাগে। তাবলীগে গেলে অন্যকে ভাল পথে,নামজের দাওাতের জন্য পাঠায়। দেখা যায় এমন অনেকেই যায়  যারা আগে নিজেই খুব একটা নামাজ কালাম পড়তনা। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগত, ও নিজেই ঠিকনাই অন্যকে ঠিক হওয়ার জন্য কিভাবে পরামর্ষ দেয়। এইটা আমার মনেও প্রশ্ন ছিল । একদিন এর উত্তর আমি পেয়েছিলাম। উত্তরটা আমার খুব মনে ধরেছিল। কেউ যখন আরেকজনকে কোন কিছু করার জন্য  বলে তখন তার মনে এইটা গেথে যায়, তার মনে বার বার এইটা খেলতে থাকে। যেমন কেউ যদি কোন কিছু পড়ার পর  সেটা আরেকজনকে বোঝায় তখন সেই পড়া যে বোঝাল তার মনের মধ্যে খুব ভাল করে রয়ে যায় এবং কোন কিছু অপরিষ্কার থাকলে সেটা ক্লিয়ার হয়ে যায়।
আর এইসব কারনেই আমি উপরের কথাগুলা আমার নিজেকেই বলতেছি ।

নীল কলম আর আমার ছেড়া খাতা

মাঝে মাঝেই আমার ছেড়া খাতায় কিছু লিখতে ইচ্ছা করে। কিন্তু বেশীরভাগ সময়ই বড় আলসেমি লাগে। রাত যত গভীর হয় লেখার ইচ্ছাটা তত তীব্র হয়। মনের মধ্যে কত সুন্দর সুন্দর কথা ঘুরে তখন,আমি নিজেই অবাক হয়ে যায়। কিন্তু কলম নিয়ে বসতে গেলেই কালি কোথায় যেন সব হারিয়ে যায়।
সাধারণ শ্রেণীর মানুষ, নিজের সম্পর্কে বলার বিশেষ কিছুই নেই। গল্প পড়তে,ছবি তুলতে অনেক ভাল লাগে আর গান শুনতে।মুভি,সিরিয়াল দেখতেও অনেক পছন্দ করি।
প্রিয় লেখক ‘হুমায়ুন আহমেদ’ আর প্রিয় সিরিয়াল ‘ফ্রেন্ডস’। প্রিয় ফুল ‘কদম’, যদিও দেখার খুব কম সুযোগ হয়।জানিনা কোন এক অদ্ভুত কারনে এইটা প্রিয় ফুলের তালিকায় সবচেয়ে আগে তার পরেই সাদা গোলাপ।   প্রিয় রং নীল এবং কাল। রাগ,অভিমান,ভালবাসা তিনটাই একটু বেশী বেশী 😛  রাগ অবশ্য বেশীক্ষণ থাকেনা,  এমনও হয় কি কারনে রাগ করেছিলাম সেটাই ভুলে যায় 😀 ।
বৃষ্টি খুব উপভোগ করি অবশ্য ঝুম বৃষ্টি। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ এক অদ্ভুত নেশা তৈরি করে,ছোট বেলার সুখময় স্মৃতি । এখনও মন খুব আশান্ত হলে নেশাগ্রস্ত হওয়ার কল্পনা করি,ইট পাথরের এই শহরে যার কোন সুযোগ নেই 😦
চাঁদের আলো এবং সমুদ্র খুব প্রিয় ,আর ২টার কম্বিনেশন যদি হয়ে যায় তাহলেতো কথাই নেই ।

00